প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেনের আত্মত্যাগে মিলল রাষ্ট্রের স্বীকৃতি

থানচি (বান্দরবান) প্রতিনিধি:

বান্দরবানের দুর্গম থানচি উপজেলার তিন্দু ইউনিয়নের তিন্দু নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকটে পরিচালিত বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেন-এর অসাধারণ আত্মত্যাগ ও মানবিক সংগ্রামের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিলে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসে। পরে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে শিক্ষামন্ত্রীকে নির্দেশ দেওয়া হয়।

রোববার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী তিন্দু নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি শিগগিরই জাতীয়করণ করা হবে।

জানা গেছে, ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ৫৬ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে পরিচালিত হয়ে আসছে। অধিকাংশ শিক্ষার্থী দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় নিয়মিত বেতন পরিশোধ সম্ভব হয় না। ফলে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রদান এবং বিদ্যালয়ের সার্বিক কার্যক্রম সচল রাখা ছিল বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ।

এই কঠিন পরিস্থিতিতে বিদ্যালয়টি টিকিয়ে রাখতে অনন্য ভূমিকা রাখেন প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেন। ছুটির দিনগুলোতে তিনি থানচি-তিন্দু-রেমাক্রী নৌপথে ইঞ্জিনচালিত নৌকা চালিয়ে পর্যটক ও স্থানীয় যাত্রী পরিবহন করেন। সেই আয় থেকেই শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধে সহায়তা করে আসছেন তিনি।

শুধু চলতি বছরের মার্চ ও এপ্রিল মাসেই নৌকা চালিয়ে তিনি প্রায় ৪০ হাজার টাকা আয় করেন। এর মধ্যে প্রায় ৩০ হাজার টাকা সহকর্মীদের বেতন পরিশোধে ব্যয় করেন। একজন প্রধান শিক্ষকের এমন ব্যতিক্রমী আত্মত্যাগের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে ব্যাপক প্রশংসার সৃষ্টি হয়। অনেকেই দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে শিক্ষা টিকিয়ে রাখতে তাঁর এই উদ্যোগকে বিরল দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেন।

পরবর্তীতে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে এলে বিদ্যালয়টির দীর্ঘদিনের সংকট নিরসনে জাতীয়করণের নির্দেশ দেওয়া হয়।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ হলে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার অনিশ্চয়তা দূর হবে, শিক্ষার পরিবেশ আরও উন্নত হবে এবং দুর্গম তিন্দু এলাকার কোমলমতি শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষার আরও বিস্তৃত সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে এই উদ্যোগ পার্বত্য অঞ্চলে শিক্ষা বিস্তারে সরকারের আন্তরিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হবে।

এদিকে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রধানমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা দ্রুত জাতীয়করণের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম সম্পন্ন করার দাবি জানিয়ে বলেন, এর মাধ্যমে শুধু একটি বিদ্যালয়ের সংকটই দূর হবে না, বরং দুর্গম পাহাড়ি জনপদে শিক্ষার আলো আরও শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে।