ভাইরাল সংস্কৃতি, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সময়ের সংকট
মহিবুল ইসলাম
প্রভাষক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
ডিজিটাল যুগে মানুষের পরিচয়, মর্যাদা এবং সামাজিক স্বীকৃতির ধারণা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একসময় একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের পরিচয় মূলত তাঁর শ্রেণিকক্ষ, গবেষণা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে আজ একজন শিক্ষক একই সঙ্গে জনবুদ্ধিজীবী, কনটেন্ট নির্মাতা, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কিংবা সামাজিক প্রভাবক (ইনফ্লুয়েন্সার) হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে পারেন। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তাশরিক-ই-হাবিবকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সৃষ্টি হওয়া বিতর্ক এবং পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত এই বৃহত্তর বাস্তবতাকেই নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
ঘটনাটিকে কেবল একজন ব্যক্তির সাফল্য, ব্যর্থতা বা বিতর্ক হিসেবে দেখলে এর গভীর সামাজিক তাৎপর্য অনুধাবন করা সম্ভব নয়। বরং এটি আমাদের সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের সামাজিক ভূমিকার সীমা কোথায়? ব্যক্তিগত আত্মপ্রকাশ এবং পেশাগত দায়বদ্ধতার মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে নির্ধারিত হবে? আর ডিজিটাল যুগে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের মর্যাদা ও মূল্যবোধ কীভাবে সংরক্ষণ করবে?
সমাজবিজ্ঞানের ভাষায়, আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে “মনোযোগ” (Attention) নিজেই একটি মূল্যবান সম্পদে পরিণত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইক, শেয়ার, ভিউ কিংবা ফলোয়ারের সংখ্যা অনেক ক্ষেত্রেই সামাজিক স্বীকৃতির নতুন মানদণ্ড হিসেবে কাজ করছে। ফলে মানুষ শুধু নিজের কাজ নয়, নিজেকেও একটি “ব্র্যান্ড” হিসেবে উপস্থাপন করতে উৎসাহিত হচ্ছে। এই বাস্তবতায় একজন শিক্ষকও এর বাইরে নন। তিনি যদি গান করেন, লেখেন, নাটকে অভিনয় করেন কিংবা অন্য কোনো সৃজনশীল কাজে যুক্ত হন, তবে সেটি স্বাভাবিকভাবেই বৃহত্তর জনপরিসরে দৃশ্যমান হবে।
তবে সমস্যার সূত্রপাত হয় তখন, যখন সমাজের প্রচলিত প্রত্যাশা এবং ব্যক্তির আত্মপ্রকাশের ধরন একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। সমাজ এখনও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের একটি নির্দিষ্ট প্রতিচ্ছবি ধারণ করে। গভীর জ্ঞানচর্চায় নিমগ্ন, সংযত এবং বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডে নিবেদিত একজন ব্যক্তি। ফলে যখন কোনো শিক্ষক সামাজিক মাধ্যমে ভিন্নধর্মী উপস্থিতি তৈরি করেন, তখন অনেকের কাছে তা প্রতিষ্ঠিত ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে হয়। প্রশ্ন হলো, এই প্রত্যাশা কতটা যৌক্তিক এবং কতটা সময়োপযোগী?
বিশ্ববিদ্যালয়কে আমরা প্রায়ই জ্ঞানের মুক্তচর্চার স্থান হিসেবে দেখি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় একই সঙ্গে একটি প্রতিষ্ঠানও, যার নিজস্ব মূল্যবোধ, নিয়ম এবং মর্যাদার কাঠামো রয়েছে। তাই কোনো ব্যক্তির আচরণ যদি প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি বা একাডেমিক পরিবেশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে বিবেচিত হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠান প্রতিক্রিয়া জানাতেই পারে। তবে সেই প্রতিক্রিয়া যেন স্বচ্ছ, ন্যায্য এবং যুক্তিনির্ভর হয়, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই প্রসঙ্গে আমাদের আরেকটি বিষয় বিবেচনা করা দরকার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া কোনো বিষয়কে আমরা প্রায়ই বাস্তবতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে ফেলি। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো এমনভাবে নির্মিত যে সেখানে আবেগ, কৌতূহল এবং বিতর্ক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে কোনো ব্যক্তি বা ঘটনাকে কেন্দ্র করে মুহূর্তের মধ্যে ব্যাপক জনমত তৈরি হতে পারে। কিন্তু ভাইরাল হওয়া এবং প্রকৃত সামাজিক গুরুত্ব, এই দুই বিষয় সবসময় এক নয়। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিক্রিয়াকে একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করা বিপজ্জনক হতে পারে।
একইভাবে, একজন শিক্ষকের মূল্যায়নও কেবল তাঁর সামাজিক মাধ্যমের উপস্থিতির ভিত্তিতে করা উচিত নয়। তাঁর শিক্ষাদান, গবেষণা, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সম্পর্ক, একাডেমিক অবদান এবং পেশাগত আচরণ, সবই সমানভাবে বিবেচ্য। অন্যদিকে, শিক্ষকদেরও উপলব্ধি করতে হবে যে জনপরিসরে তাঁদের প্রতিটি কর্মকাণ্ড বৃহত্তর সামাজিক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিতে পারে। ফলে আত্মপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে একটি পেশাগত দায়িত্বও জড়িত থাকে।
তাশরিক-ই-হাবিবকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনা তাই মূলত একজন ব্যক্তিকে নিয়ে নয়; এটি আমাদের সমাজের পরিবর্তিত বাস্তবতাকে নিয়ে। এখানে মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে ডিজিটাল জনপ্রিয়তার সংস্কৃতি এবং একাডেমিক প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্যগত মূল্যবোধ। একদিকে ব্যক্তি নিজের বহুমাত্রিক পরিচয় প্রকাশ করতে চান, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠান তার পেশাগত মানদণ্ড বজায় রাখতে চায়। এই দ্বন্দ্ব শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বব্যাপী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও ক্রমশ দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে প্রয়োজন পরস্পরকে দোষারোপ করা নয়; বরং একটি ভারসাম্যপূর্ণ আলোচনা। বিশ্ববিদ্যালয়কে যেমন নতুন সামাজিক বাস্তবতা বোঝার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে, তেমনি শিক্ষকদেরও উপলব্ধি করতে হবে যে তাঁদের ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ড অনেক সময় প্রতিষ্ঠানের পরিচয়ের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে যায়। মুক্তচিন্তা, সৃজনশীলতা এবং পেশাগত দায়বদ্ধতা, এই তিনটির মধ্যে একটি সুস্থ ভারসাম্যই হতে পারে ভবিষ্যতের পথ।
শেষ পর্যন্ত, এই ঘটনা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। ডিজিটাল যুগে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক কে? কেবল শ্রেণিকক্ষের একজন জ্ঞানদাতা, নাকি বহুমাত্রিক সামাজিক পরিচয়ের একজন নাগরিক? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্যেই হয়তো নিহিত রয়েছে আমাদের উচ্চশিক্ষা এবং ডিজিটাল সমাজের ভবিষ্যৎ পথরেখা।
বার্তা প্রেরক: মাহতাব চৌধুরী, নোবিপ্রবি প্রতিনিধি।
এইমাত্র | EiMatro TV | এইমাত্র টিভি এইমাত্র | EiMatro TV | এইমাত্র টিভি
