শোকজের পর তদন্ত, প্রতিবেদন জমার তিন দিনের মাথায় বদলি; আদেশে কারণ ‘জনস্বার্থ’
ময়মনসিংহ প্রতিনিধি:
ময়মনসিংহ সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের দুই কর্মচারীর বিরুদ্ধে ঘুষ চাওয়ার অভিযোগের তদন্ত চলার মধ্যেই বদলি হয়েছেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনিকা পারভীন। অভিযোগের পর দুই কর্মচারীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ, ৬ সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন জমা এবং ৯ সেপ্টেম্বর মনিকা পারভীনের বদলির আদেশ—এই সময়ক্রমকে ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
তবে প্রকাশ্য নথি অনুযায়ী, ঘুষ চাওয়ার অভিযোগটি মনিকা পারভীনের বিরুদ্ধে নয়। তাঁর কার্যালয়ের দুই কর্মচারী এ এইচ এম নাদিরুল হাসান সবুজ ও মো. মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ করা হয়েছে।
বদলির আদেশে কারণ ‘জনস্বার্থ’
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ৯ সেপ্টেম্বরের আদেশে মনিকা পারভীনকে ময়মনসিংহ সদর থেকে নান্দাইলে এবং নান্দাইলের উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফজিলাতুন নেছাকে ময়মনসিংহ সদরে বদলি করা হয়। আদেশে বদলির কারণ হিসেবে ‘জনস্বার্থ’ উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, দুই কর্মচারীর বিরুদ্ধে ওঠা ঘুষ চাওয়ার অভিযোগের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার মাত্র তিন দিনের মাথায় বদলির আদেশ হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
তবে সময়ের এই নৈকট্য থেকেই বদলির সঙ্গে অভিযোগের সরাসরি সম্পর্ক ছিল—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার মতো প্রকাশ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের সূত্র যেভাবে
মায়ের মৃত্যুর পর সরকারি পাওনা টাকা তুলতে গিয়ে ঘুষ চাওয়ার অভিজ্ঞতার পর ১৭ বছর বয়সী শাহেদ শরীফ আহমেদ ‘ঘুষ.সাইট’ নামে একটি ওয়েবসাইট তৈরি করেন। বিষয়টি নিয়ে প্রথম আলোতে প্রতিবেদন প্রকাশের পর ৩১ আগস্ট ময়মনসিংহ সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের দুই কর্মচারীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।
অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করা হয়।
অভিযোগের সূত্র যাঁর বক্তব্য থেকে এসেছে, সেই শাহেদ শরীফ আহমেদ প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মনিকা পারভীনের বিরুদ্ধে তাঁর ব্যক্তিগত কোনো অভিযোগ নেই।
অর্থাৎ প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী, অভিযোগের প্রশাসনিক কার্যক্রমের লক্ষ্য ছিলেন ওই দুই কর্মচারী; উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মনিকা পারভীন নন।
৬ সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন জমা
তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রধান ও উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সিকদার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ জানিয়েছেন, তদন্ত শেষে ৬ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।
তবে তদন্ত প্রতিবেদনের পূর্ণাঙ্গ বিষয়বস্তু এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে অভিযোগের সত্যতা কতটা পাওয়া গেছে, অভিযুক্ত দুই কর্মচারীর বক্তব্য কী ছিল কিংবা তাঁদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে—এসব বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
বদলির বিষয়ে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার বক্তব্য
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, মনিকা পারভীনের বদলির আদেশ জেলা কার্যালয় থেকে হয়নি; প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে হয়েছে।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মনিকা পারভীন ময়মনসিংহ সদরে তিন বছরের বেশি সময় দায়িত্ব পালন করেছেন। সাধারণত একই কর্মস্থলে তিন বছরের বেশি থাকার সুযোগ নেই।
তিনি আরও জানান, নান্দাইলের উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফজিলাতুন নেছা আগে ময়মনসিংহ সদরে বদলির আবেদন করেছিলেন। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই দুই কর্মকর্তার বদলি হয়ে থাকতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
শফিকুল ইসলাম আরও বলেন, ‘ঘুষ.সাইট’–সংক্রান্ত ঘটনার কারণে মনিকা পারভীনকে বদলি করা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন না।
ফলে জেলা পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্যে বদলির একটি প্রশাসনিক ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে। তবে বদলি আদেশে ‘জনস্বার্থ’ ছাড়া বিস্তারিত কারণ উল্লেখ করা হয়নি।
বদলি স্থগিত চেয়ে আবেদন
বদলির আদেশের পর ১০ সেপ্টেম্বর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে আদেশ স্থগিতের আবেদন করেছেন মনিকা পারভীন।
আবেদনে তিনি উল্লেখ করেছেন, তাঁর স্বামী ময়মনসিংহ বিভাগীয় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিচালক হিসেবে কর্মরত। তাঁদের একমাত্র মেয়ে ময়মনসিংহের বিদ্যাময়ী সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং ২০২৭ সালে এসএসসি পরীক্ষা দেবে।
মেয়ের পড়াশোনার বিষয়টি বিবেচনা করে অন্তত এসএসসি পরীক্ষা পর্যন্ত বদলি স্থগিত রাখার আবেদন করেছেন তিনি।
তাঁর আবেদনের সমর্থনে ময়মনসিংহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে একটি ডিও লেটার দিয়েছেন।
চারটি বিষয় এখনো স্পষ্ট নয়
ঘটনাটি বিশ্লেষণে চারটি বিষয় আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।
প্রথমত, অভিযোগ: দুই কর্মচারীর বিরুদ্ধে ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ উঠেছে এবং তাঁদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, তদন্তের ফল: অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার মতো তদন্ত প্রতিবেদন বা অন্য কোনো প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
তৃতীয়ত, তদন্ত প্রতিবেদন: তদন্ত কমিটি ৬ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তবে এর ফলাফল ও সুপারিশ প্রকাশিত হয়নি।
চতুর্থত, বদলি: মনিকা পারভীনের বদলি আদেশে কারণ হিসেবে ‘জনস্বার্থ’ উল্লেখ করা হয়েছে। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার বক্তব্যে দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন এবং নান্দাইলের কর্মকর্তার বদলির আবেদনের বিষয়টি এসেছে।
সুতরাং, অভিযোগকে প্রমাণ হিসেবে এবং তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সঙ্গে বদলির সময়ের নৈকট্যকে সরাসরি কারণগত সম্পর্ক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী, মনিকা পারভীনের বিরুদ্ধে ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ নেই। একইভাবে তাঁর কার্যালয়ের দুই কর্মচারীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্তের ফলও এখনো প্রকাশিত হয়নি।
বিষয়টির স্বচ্ছ নিষ্পত্তির জন্য একদিকে তদন্ত প্রতিবেদনের ফলাফল এবং অন্যদিকে মনিকা পারভীনের বদলির প্রশাসনিক ভিত্তি—দুটিই স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
এইমাত্র | EiMatro TV | এইমাত্র টিভি এইমাত্র | EiMatro TV | এইমাত্র টিভি
